ডিপ্রেশন কি এবং কেন এতে বেশিরভাগ লোক আত্মহত্যা করে??

 


ডিপ্রেশন কি এবং কেন এতে বেশিরভাগ লোক আত্মহত্যা করে

বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি এমনিতেই খুব খারাপ। দেশে নানা দিক থেকে সমস্যা। তারউপর দীর্ঘদিন ধরে লোকডাউন, তাই  অনেক লোকই বিষন্নতা (ডিপ্রেশন) এর শিকার হয়েছেন। ইতিমধ্যেই আমাদের সামনে অনেক আত্মহত্যা এর মতো ভয়ানক তথ্য সামনে এসেছে। তাই প্রত্যেক মানুষেরই এই বিষয় একটা প্রাথমিক ধারণা থাকা দরকার।যাতে আমরাও আমাদের আশেপাশে থাকা অন্তত কিছু লোকের সাহায্য করতে পারি। বিষন্নতা কি?  কেন হয়?  এর লক্ষণ কি? কিভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে? আপনার বা আপনার আশেপাশের লোকেদের হলে আপনার কি করণীয়? মূলত এরকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নীচে দেওয়া হলো। 

বিজ্ঞানভিত্তিক কিছু সমীক্ষা অনুযায়ী প্রত্যেক বছর প্রত্যেক দেশের 20% লোক বিষন্নতাই ভুগে, যা মোটেও সমীচীন নয়। সমীক্ষা অনুযায়ী আরও জানা যায় যে প্রত্যেক ৩ জন মেয়ের একজন এবং প্রত্যেক ৮ জন ছেলের একজন জীবনে একবার হলেও বিষন্নতা এর মধ্য থেকে জীবন ব্যাতিত করে। এদের মধ্যে যারা এই পরিস্থিতিকে মেনে এর বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা বেরিয়ে যায়। আর যারা মানতে পারেনা তারা আত্মহত্যা এর মতো ভুল কাজ করে বসে।


বিষন্নতা (depression) আসলে কি? 

আমরা সবাই জীবনে কখনো না কখনো দুঃখী বা নিজেকে বাকিদের থেকে কম বলে মনে করি। মূলত এর থেকেই শুরু হয় বিষন্নতা (depression) এর। আসলে বিষন্নতা হলো এক মারাত্মক ও মানসিক রোগ যা অনেক মানুষেরই হয়ে থাকে। আর তো আর মূল কথা হল বেশিরভাগ লোক জানতেই পারেনা যে তারা বিষন্নতা এর শিকার হয়ে গেছেন। অনেকে দুঃখী হওয়া এবং বিষন্নতাকে এক বলে ভেবে নেন। কিন্তূ এই দুটো মোটেও এক জিনিস নয়। দুঃখী হওয়া হলো একটি সাময়িক জিনিস,  যা বেশিক্ষন থাকেনা তবে বিষন্নতা একটি মানসিক রোগ যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এবং দীর্ঘদিন ধরে এর প্রভাব ব্যাক্তিগত জীবনে পড়ে। এর ফলে আপনার কাজ, আপনার সম্পর্ক জীবন এবং আরও অন্যান্য জায়গায় বিকৃতি দেখা দিতে পারে। 


ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা কেন হয়?  

বিষন্নতা এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। এটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে এর জন্ম মূলত নিজেকে ছোট বা একা মনে করা থেকেই শুরু হয়। বাবা-মা বা কোনো কাছের মানুষকে হারালে, নিজেকে বাকিদের থেকে কম বা ছোট মনে হলে, কোনো তীব্র অপমান এর কারণে, অনুশোচনা বা খেদ (regret) বা এমন যেকোনো অবস্থা যার থেকে আপনার মন আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তা থেকে ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা এর সৃষ্টি হতে পারে। 


বিষন্নতা এর লক্ষণ / কিভাবে বুঝবেন আপনি বা আপনার আশেপাশের কোনো লোক  ডিপ্রেশন এ আছে কিনা?  

#1)  কথা বলার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলা। 

#2) মনের ভাব প্রকাশে অনীহা করা। 

#3) নতুন কিছু শুরু করার বা নতুন কিছু জিনিস জানার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলা। 

#4) সবসময় একাকি বোধ করা। 

#5) খাওয়া দাওয়া এর ইচ্ছা হ্রাস হওয়া, ফলে হটাৎ করে ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়ার সমস্যা। 

#6) কোনোকিছু ভালো লাগার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। 

#7) জীবনের প্রতি ঘৃণা বা উদাসীনতা মনে করা। 

#8) কিছু না পাওয়ার খেদ থেকে যাওয়া। 

#9) ভালোভাবে জীবনকে উপলব্ধি করতে না পারা। 

#10) স্বাভাবিক জীবনে নানা পরিবর্তন দেখা দেওয়া। যেমন-- ঘুমের বেশি বা কম, কখনো কিছু জিনিস এর চাহিদা বেশি বা কম। 

#11) নিজের প্রতি অতিরিক্ত ক্রোধ হওয়া কিছু কারণে। 

#12) বেশিরভাগ সময় অকারণে দুঃখী হওয়া। 

ডিপ্রেশনের জন্য আমরাই দায়ী। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যেমন মা-বাবা দায়ী, তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই দায়ী, বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ দায়ী। সব কথার শেষ কথা হলো, ডিপ্রেশন যেহেতু মানসিক রোগ, সেহেতু ওই রোগের আক্রমণকে অনুভব করে, নিজেই নিজের শিক্ষক হতে পারলে বহুলাংশে উপকৃত হওয়া যায়।


ডিপ্রেশন এর বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াই করবেন?  

নিজে ডিপ্রেশন এর শিকার হলে মূলত অনেক ক্ষেত্রে নিজে এ বিষয় কোনোরকমের চিন্তার ভাবনা আসেনা, তবুও এরকম কিছু পদ্ধতি বা ধাপ রয়েছে যেগুলো অনুসরণ এর মাধ্যমে আপনি ডিপ্রেশন বা বিষন্নতাকে এড়িয়ে যেতে পারেন বা পুরোপুরি মুক্তি পেতে পারেন। 

#1) নিজের সবকিছুটাকে মেনে নেওয়া। এবং আপনার কাছে যা আছে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া অর্থাৎ ভালো-খারাপ উভয়দিক বিচার করে নিজেকে সবসময় নিজেকে ভালো এর দিকে প্রতিষ্ঠিত করা। যেমন -আপনার যদি মনে হই আপনার বাড়িতে ছোট আপনি আপনার থেকে নিচু স্তরের কারো কথা ভেবে দেখুন যার কাছে আপনার থেকেও ছোট বাড়ি আছে। তারপর নিজের প্রতি খুশি হন যে আপনার যা আছে তাতেই আপনি খুশি। 

#2) প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে এবং নিজের জীবনেকে ধন্যবাদ বলা, আপনার জীবনে যা কিছু আছে বা চলছে তার জন্য। 

#3) রোগ আসবে কিন্তু রোগী হওয়া ঠিক নয়। রোগ দেহের হয়, চিকিৎসা করা দরকার কিন্তু মন যেন রোগাক্রান্ত না হয়ে যায়।

#4) প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করুন। কারণ যখন আপনি কিছু শেখার চেষ্টা করেন তখন আপনার মনের বা বুদ্ধির  বিকাশ ঘটে। ফলে ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা দূর হয়। 

#5) সপ্তাহে অন্ততপক্ষে ৩ দিন শারীরিক ব্যায়াম বা কসরত করুন। ব্যায়াম করলে আমাদের মস্তিস্ক থেকে কিছু হরমোন বেরোই যার ফলে ডিপ্রেশন থাকেনা। 

#6) নিজেকে কখনো কারো সঙ্গে তুলনা করবেননা। সবসময় মনে রাখবেন আপনার মতো কেউ নেয়। আপনি যা পারেন তা আর কেউ পারেনা। তুলনায় হয় আপনি নিজেকে বড়ো ভাববেন নাহলে নিজেকে অন্যের থেকে ছোট ভাববেন। আর বিস্বাস করুন দুটোই মানব জীবনের পক্ষে ক্ষতিকর। 


আপনার বা আপনার আসেপাশের লোকেদের কারো বিষন্নতা হলে আপনার কি করণীয়

কোনোক্রমে আপনি যদি আপনার বা আপনার আসেপাশের কোনো লোকের বিষন্নতা এর প্রতি সজাগ হন। তাহলে নিজের নোকোমাত্মক চিন্তা ভাবনা এড়িয়ে চলুন। নিজের এবং নিজের জীবনের ভালো মুহূর্ত এর প্রতি সজাগ হন। অন্যের সঙ্গে কথা বলার বা নিজের কষ্ট গুলো ব্যাক্ত করার বা নিজেকে কোনো বিশ্বস্ত ব্যাক্তির কাছে উপস্থাপন করার চেষ্টা করুন। এবং উপরিউক্ত বিষয়গুলির প্রতি নজরদিন। অবশেষে ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال

close