ভূমিকা:
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ন আন্দোলন ছিল ১৯৪৬ সালে সংঘটিত নৌবিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের মাধ্যমেই ভারতের স্বাধীনতার অন্তিম লগ্নে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তার আজাদ হিন্দ ফৌজের সাহসিকতাপূর্ণ লড়াইয়ের পর নৌবিদ্রোহ ছিল একমাত্র আন্দোলন যার মধ্যে দিয়ে ভারতীয় নাবিকরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্ত একটি মন্তব্য করেছেন, "ভারতের ইতিহাসে নৌবিদ্রোহ এক নবযুগের সূচনা করে।" এছাড়া ড. সুমিত সরকারের মতে, নৌবিদ্রোহ ছিল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের উপক্ষান গুলির মধ্যে সবচেয়ে বিরচিত।" তৎকালীন সময়ে ভারতীয় নৌসেনাদের এই বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ব্রিটিশ কর্মচারীদের অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুম সহ্য করতে না পেরেই তারা বিদ্রোহের পথে হেঁটেছিল। তবে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার বেশ কিছু কারণ ছিল।
নৌবিদ্রোহের কারণ:
১. বর্ণবৈষম্য নীতি:
ভারতীয় নাবিক বা নৌসেনারা ব্রিটিশ অফিসারদের চোখে ছিলেন অত্যন্ত ঘৃণার পাত্র। শেতাঙ্গ ব্রিটিশরা কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় নৌসেনাদের উপর বরাবরই অত্যাচার করত। নৌসেনার একমাত্র উচ্চপদ শুধুমাত্র ব্রিটিশ নৌসেনাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতীয় নাবিকদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকা সত্বেও তাদেরকে এই পদে বসার সুযোগ দেওয়া হত না।
২. নিম্ন মানের খাদ্য:
নৌসেনাতে নিযুক্ত ব্রিটিশ অফিসারদের উৎকৃষ্ট এবং ভালো মানের খাদ্য সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সেই জায়গায় ভারতীয় নাবিকদের অত্যন্ত নিকৃষ্টিমানের এবং অনেক কম পরিমাণে খাদ্য সরবরাহ করা হতো। এই সমস্ত অন্যায় ভারতীয় নাবিকদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল।
৩. বেতনগত বৈষম্য:
নৌসেনায় নিযুক্ত ভারতীয় নাবিকদের ব্রিটিশ নাবিকদের মতোই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু তা সত্বেও ভারতীয় নাবিকদের ব্রিটিশ নাবিকদের তুলনায় অত্যন্ত কম বেতন দেওয়া হতো। শুধু তাই নয় একই যোগ্যতা থাকা সত্বেও ভারতীয় নাবিকদের কখনোই পদোন্নতির সুযোগ আসত না।
৪. নিম্ন মানের অস্ত্র সরবরাহ:
নৌসেনায় নিযুক্ত ভারতীয়দের ব্রিটিশরা সবসময় নিম্ন মানের অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দিত। শুধু তাই নয় যুদ্ধ ক্ষেত্রেও তাদের একইরকম অস্ত্র সরবরাহ করা হতো। ফলত রণক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় ভারতীয় নাবিকদের প্রাণ যেত। ব্রিটিশ অফিসারদের এমন বৈষম্যমূলক আচরণের বারবার প্রতিবাদ জানিয়েও কোনো সুফল পাননি ভারতীয় নাবিকরা। ফলত তারা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ান।
৫. ভারতীয় নাবিকদের দূর্গমপূর্ন এলাকায় প্রেরণ:
ব্রিটিশ সরকার বেছে বেছে ভারতীয় নাবিকদেরই সেই সমস্ত জায়গায় প্রেরণ করত যেখানে অত্যন্ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটত। অথচ সেই জায়গায় ব্রিটিশ নাবিকদের তুলনামূলক কম দূর্গমপূর্ন এলাকায় পাঠানো হতো।
৬. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সরকার নৌবাহিনীতে বহু ভারতীয়দের নিযুক্ত করে। যুদ্ধের রণাঙ্গনে ভারতীয় নৌসেনারা বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করেন। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ ফুরিয়ে গেলে ব্রিটিশ সরকার ব্যাপক হারে ভারতের নাগরিকদের ছাঁটাই করতে শুরু করে। ফলত বহু ভারতীয় নাবিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। এই অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতীয় নাবিকরা বিদ্রোহ শুরু করেন।
৭. অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি:
এই সময় ভারতের অভ্যন্তরে গান্ধীজির নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো আন্দোলন, কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন, পুলিশ ও বিমান বাহিনীর ধর্মঘট ভারতীয় নৌসেনাদের প্রভাবিত করে।
৮. আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রভাব:
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম ভারতীয় নাবিকদের অনুপ্রাণিত করেছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন রশিদ আলীকে বিচারে সাত বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। তার মুক্তির দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রভাব ফেলে ভারতীয় নাবিকদের উপরও। তারাও গোপনে কমিটি গঠন করে ব্রিটিশ বিরোধী প্রচার চালিয়ে যান।
প্রত্যক্ষ কারণ:
নৌ-অধ্যক্ষ অ্যাডমিরাল গডফ্রে 'তলোয়ার' নামক যুদ্ধজাহাজটি পরিদর্শনে হাসলে জাহাজের বেতার কর্মী বলাইচন্দ্র দত্ত কয়েকজন ভারতীয় নাবিকদের সাথে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের উদ্দেশ্যে জাহাজের গায়ে 'ইংরেজ ভারতছাড়ো', 'জয় হিন্দ' প্রভৃতি দেশাত্মবোধক মূলক ধ্বনি লিখে রাখেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলাইচন্দ্রকে গ্রেফতার করা হয়। তার গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি নৌবিদ্রোহের সূচনা হয়।
বিদ্রোহের প্রসার:
১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১৫০০ জন নৌসেনা তলোয়ার নামক জাহাজে আন্দোলন শুরু করে। ভারতীয় নাবিকরা জাহাজে ভারতীয় ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করে। Royal Indian Navy নাম পরিবর্তন করে তারা রাখেন Indian National Navy। ভারতীয় নাবিকদের দিয়ে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ ক্রমশ কলকাতা, করাচি, মাদ্রাজ, জামনগর সহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারী দমননীতি:
বিদ্রোহের সর্বাত্মক রূপ লক্ষ্য করে ব্রিটিশ সেনাপতি অ্যাডমিরাল গডফ্রে ভারতীয় নাবিকের হুমকি দেন যে, তারা আত্মসমর্পণ না করলে বিমান থেকে গুলিবর্ষণ করে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু সমস্ত হুমকি উপেক্ষা করে ভারতীয় নৌসেনারা আন্দোলন চালিয়ে যান। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা করেও শেষপর্যন্ত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের অবসান ঘটে।
জাতীয় নেতাদের ভূমিকা:
বিদ্রোহ চলাকালীন ভারতীয় নৌসেনারা আশা করেছিল যে, তারা জাতীয় নেতাদের সহযোগিতা পাবে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি এবং কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল তাদের সমর্থিত করলেও জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ তাদের বিরোধিতা করেছিল। গান্ধীজী ভারতীয় নাগরিকদের এই কাজকে দেশের পক্ষে একটি অশুভ দৃষ্টান্ত বলে সমালোচনা করেন। মহম্মদ আলি জিন্নাহর মতে, "নৌবিদ্রোহ ছিল একটি অসমর্থিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কান্ড।" এছাড়াও জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ থেকে শুরু করে কংগ্রেস নেতা বল্লভভাই প্যাটেলও বিদ্রোহের সমালোচনা করেন।
নৌবিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব:
নৌবিদ্রোহ অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হলেও, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এটি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ঐতিহাসিক সুব্রত ব্যানার্জির মতে, "ভারতের জাতীয় জীবনে নৌবিদ্রোহ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। মহাবিদ্রোহের পর ভারতে এত বড় সেনা বিদ্রোহ আর কখনো ঘটেনি।"
১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহের যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব গুলি ছিল সেগুলি হল-
১. মন্ত্রী মিশন আগমন:
ভারতীয় নৌসেনাদের এমন ক্ষোভ ও রাগ দেখে ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ এবং জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সিদ্ধান্ত নেয়। সেই উদ্দেশ্যে মন্ত্রী মিশনকে তারা ভারতে পাঠায়।
২. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি:
নৌবিদ্রোহে ভারতের হিন্দু মুসলিম উভয় জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। যার ফলে ব্রিটিশ সরকারকে ভাবতে বাধ্য করেছিল ভারতীয় নাবিকদের নিয়ে। হিন্দু মুসলিম নাবিকদের পাশাপাশি সাধারণ জনসাধারণও এই বিদ্রোহে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চোখে ধরা পড়েছিল।
৩. ব্রিটিশ সরকারের অবসান:
১৯৪৬ সালের এই নৌবিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভারতীয় সৈনিকদের উপর নির্ভর করে ভারতে রাজত্ব করা আর সম্ভব নয় তা ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল। অর্থাৎ এই বিদ্রোহের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের মৃত্যু ঘন্টা বেজে উঠেছিল।
৪. ভারত ছাড়ার চিন্তাভাবনা:
নৌবিদ্রোহের ক্ষোভ থেকে ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, ভারতে বিদ্রোহ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকার ভারত থেকে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করে। কিন্তু বহু ঐতিহাসিক যেমন-সুচিতা মহাজন', অমলেশ ত্রিপাঠী প্রমুখদের মতে, নৌ বিদ্রোহ ভারতীয় জনসাধারণের মধ্যে সেইরকম কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায় যে, নৌবিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির কারণে ব্যর্থ হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এই বিদ্রোহের প্রভাব পরবর্তীকালে ভারতের আরো অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনে পড়েছিল। যার ফলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হতে শুরু করে। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে ভারতে আর এভাবে শাসন করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্তের মতে, নৌ বিদ্রোহ ভারতীয় ইতিহাসে এক নব দিগন্তের সূচনা করেছিল। সবকিছুর মধ্যে দিয়ে একথা বলা যায়, নৌবিদ্রোহ ছিল ভারতের অন্তিম স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ যায় যাত্রা। যার মধ্যে দিয়ে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল।